শান্তির ধর্ম প্রকৃত ইসলামের উপর একটি অন্যন্য সাধারন ওয়েবসাইট


কিছু মুসলমান রোজা দশ দিন মনে করে, গোটা রমজান মাসব্যাপী নয়, তাদের যুক্তি কি?


সুরা বাকারার ০২:১৮৪ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আইয়ামাম মা’দূদাত’ অর্থাৎ ‘(সিয়াম) নির্দিষ্ট কয়েকদিন’। ০২:১৮৫ আয়াতে বলা হয়েছে ‘যে এ মাস (রমজান মাস) প্রত্যক্ষ করবে/ দেখবে/ পাবে/ এ মাসে জীবিত থাকবে সে এ মাসে সিয়াম পালন করবে’। অর্থাৎ ‘আইয়ামাম মা’দূদাত’ বা ‘সিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকদিন’ হচ্ছে রমজান মাসের অন্তর্ভুক্ত।

তারপর বলা হয়েছে, ‘যে রোগে আক্রান্ত হবে অথবা সফরে থাকবে সে অন্য দিনসমূহে সিয়াম পালন করবে’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনগুলোতে রোগের কারণে বা সফরের কারণে সিয়াম পালন করতে না পারলে পরবর্তীতে (রমজান মাসের ভিতরে বা বাহিরে) সুবিধাজনক সময়ে অন্য দিনসমূহে সিয়াম পালন করতে হবে।

nice-pic1

কারণ, আল্লাহ রোগে আক্রান্ত ও সফরে থাকা অবস্থায় সিয়াম পালন বাধ্যতামূলক করে তাঁর বান্দাকে কষ্ট দিতে চান না। তারপর বলা হয়েছে, ‘(সিয়াম পালনের বা রোগে আক্রান্ত ও সফরে থাকা ব্যক্তি নির্দিষ্ট দিনের বাহিরে অন্য দিনসমূহে সিয়াম পালনের বিধান দেয়া হয়েছে) এজন্য যে, যেন সিয়াম পালনকারীরা সংখ্যা পূর্ণ করে (তথা পূর্ণসংখ্যক দিনে সিয়াম পালন করে)’।

তারপর ০২:১৯৬ আয়াতে আল্লাহ পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যার সংজ্ঞা দিয়ে বলেছেন যে, [তিলকা আশারাতুন কামিলাতুন] ‘(৩ ও ৭ এই দুই সংখ্যা যোগ করলে যে সংখ্যাটি হয়) উহাই পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা দশ (১০)’। অন্যভাবে বলা যায়, ‘দশদিন হচ্ছে পূর্ণসংখ্যক দিন’।

সুতরাং ১০ ই হচ্ছে পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা। সিয়াম পালনের নির্দিষ্ট কয়েকদিন (আইয়ামাম মা’দূদাত) বলতে এই পূর্ণসংখ্যক দিন ১০ দিনকে বুঝায়। সুতরাং রমজান মাসে সিয়াম মাত্র দশটি আর যে এ মাস প্রত্যক্ষ করবে সে এ মাসে ‘আইয়ামাম মা’দূদাতে’ বা ‘নির্দিষ্ট কয়েকদিনে’ সিয়াম পালন করবে যার সরাসরি সংখ্যা পালন করার ব্যাপারে নির্দেশনা হচ্ছে, ‘ওয়ালিতুকমিলুল ইদ্দাতা’ ‘যেন তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো/ পুর্ণসংখ্যক দিনে সিয়াম পালন করো’। আর তা হচ্ছে ‘তিলকা আশারাতুন কামিলাতুন’ অর্থাৎ ‘পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা ১০’। অতএব, রমজান মাসে দশদিন সিয়াম পালন করতে হবে।

(ক) পুর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা ১০। এ তথ্যটি ০২:১৯৬ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। আর বাস্তবেও মানব সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ যে সংখ্যা গণনা পদ্ধতি শুরু করেছে এবং তা চালু রয়েছে তাতে ‘পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা হচ্ছে ১০’। আদিতে মানুষ হাতের আঙ্গুলের মাধ্যমে সংখ্যা গণনা শুরু করেছে এবং দুই হাতে থাকা দশটি আঙ্গুলের মাধ্যমে দশ পর্যন্ত গুণে তারপর আবার তার সাথে এক যোগ করে এগারো, দুই যোগ করে বারো, এভাবে দুই দশে বিশ, তিন দশে ত্রিশ এবং দশ দশে একশত, দশ একশতে এক হাজার ইত্যাদি ক্রমধারায় গণনা চালু রেখেছে। অর্থাৎ দশে এসে সংখ্যা পূর্ণ হয়ে যায়।

(খ) দশ হচ্ছে সেই সংখ্যা যেখানে ১-৯ এর মধ্য থেকে প্রথমটি তথা ১ এবং সেই সাথে ০ ব্যবহার করে একটি সংখ্যা তৈরির মাধ্যমে সংখ্যাকে পূর্ণতা দেয়া হয়েছে। ১০ সংখ্যাটিতেই ০ এর প্রথম ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ২০ হচ্ছে পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যার দ্বিগুণ অর্থাৎ দুইবার সংখ্যা পূর্ণ হলে ২০ হয়, তথা ২০ হচ্ছে দ্বিতীয়বার পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যায় পৌছা। সুতরাং ‘পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা ১০’ এটি একটি প্রমাণিত, স্বত:সিদ্ধ ও শাশ্বত প্রতিষ্ঠিত সত্য।

(গ) পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা দশকে বুঝানোর জন্য বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন প্রবাদ ও প্রমাণ রয়েছে। যেমন বাংলা ভাষায় পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যাকে কেন্দ্র করে যেসব প্রবাদ তৈরি হয়েছে তার কিছু নিম্নরূপঃ

১. কোন একটি কথা সর্বসম্মত কিনা তা জানতে গিয়ে বলা হয় ‘দশজনে কী বলে?’

২. সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উপকারিতা বলতে গিয়ে বলা হয় ‘দশের লাঠি একের বোঝা’।

৩. ‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’।

৪. ‘দশচক্রে ভগবান ভুত’।

৫. ‘হাতে গোণা দশদিন’, এটিও বহুল প্রচলিত কথা যা পুর্ণ সংখ্যা ১০ কে চিহ্নিত করে।

৬. দিক নির্ণয়ের সংখ্যা পূর্ণ হয়েছে ‘দশদিক’ নির্ণয় করে।

৭. হিন্দুরা তাদের দুর্গার শক্তির পূর্ণতা বুঝানোর জন্য দুর্গার মূর্তিতে দশটি হাত সন্নিবেশিত করেছে।

৮. হিন্দুদের মধ্যে ‘দশরথ’ এর ধারণাও পূর্ণসংখ্যা ১০ থেকে এসেছে।

(ঘ) কিয়ামাতের দিনও সর্বনিম্ন সংখ্যা ১ ও সর্বোচ্চ সংখ্যা ১০ কে কেন্দ্র করে লোকদের মধ্যে দুনিয়ায় অবস্থানকাল নির্ণয় সম্পর্কে আলোচনা হবে (দেখুন ২০:১০৩-১০৪)

(ঙ) আল্লাহ সৎকর্মের প্রতিফল দশগুণ দিবেন অর্থাৎ পূর্ণসংখ্যার সমগুণ দিবেন (দেখুন ০৬:১৬০)

(চ) মু’মিন ও কাফিরদের মধ্যে যুদ্ধে মু’মিনরা বিজয়ী হওয়ার জন্য কাফেরদের সর্বোচ্চ অনুপাত রাখা হয়েছে ১০, অর্থাৎ গড়ে ১ জন মু’মিন ১০ জন কাফিরের মোকাবেলা করতে পারবে (দেখুন ০৮:৬৫)।

(ছ) ইহুদীরা তাদের নিজেদের ব্যাপারে যদি তারা জাহান্নামে যায়ও তবু হাতে গোণা কয়েকদিন ছাড়া জাহান্নামে থাকবে না বুঝাতে ‘আইয়ামাম মা’দূদাত’ শব্দ ব্যবহার করেছে। (দেখুন ০২:৮০, ০৩:২৪)। পুর্বোক্ত আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, ‘আইয়ামাম মা’দূদাত’ দ্বারা ০৩-১০ দিনকে বুঝায়। অর্থাৎ আইয়ামাম মা’দূদাতের সর্বোচ্চ সংখ্যা হচ্ছে পূর্ণসংখ্যা ১০।

এমনিভাবে বিশ্বের মানবসমাজে ১০ ই পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে যে ধারণা তারা আসমানী কিতাব থেকেই গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ আসমানী সংবিধান আল কুরআনে আল্লাহ ১০ কেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত সংখ্যা বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

সুতরাং রমজান মাসে ২৯ বা ৩০ দিন সিয়াম পালন হতে পারে না, বরং পূর্ণসংখ্যক দিন অর্থাৎ ১০ দিন সিয়াম পালন করতে হবে।

৮৯:০২ আয়াতে বলা হয়েছে ‘দশ রাতের কসম’। যেহেতু রমজানে পূর্ণসংখ্যক দিনে সিয়াম পালন করতে হবে এবং ০২:১৮৭ আয়াতে ‘’লাইলাতাস সিয়াম’ শব্দের মাধ্যমে সিয়াম পালনকারীদের জন্য রাতের বেলায় স্ত্রীসহবাস বৈধ করা হয়েছে কিন্তু ঐ রাতসমূহে যারা মসজিদে এতেকাফ করবে তাদের জন্য রাতের বেলায়ও স্ত্রীসহবাস বৈধ করা হয়নি, তাই দশ রাত বলতে যে দিনগুলোতে দিনের বেলায় সিয়াম এবং রাতের বেলায় এতেকাফ পালন করা হয় তাকেই বুঝায়। অর্থাৎ এতেকাফ হবে দশরাত। সুতরাং সিয়ামও হবে দশদিন।

‘আল্লাহ মানুষের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা কঠিন তা চান না’ কথার তাৎপর্য হচ্ছে ‘আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে যত বিধান দিয়েছেন তা মানুষের জন্য সহজসাধ্য, ফিতরাত বা স্বভাব-সুন্দর প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূণ ও কল্যাণকর’। ০২:১৮৫ আয়াতে এ বাক্যটির আগে ও পরে আল্লাহর বিধান কষ্টদায়ক না হওয়ার দুটি প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে। যথা –

(ক) যদি কেউ রোগে আক্রান্ত হয় বা সফরে থাকে তাহলে তাকে নির্দিষ্ট দিনসমূহের পরিবর্তে অন্য দিনসমূহে সিয়াম পালনের বিধান দেয়া হয়েছে।

(খ) ‘ওয়ালিতুকমিলুল ইদ্দাতা’ বা ‘যেন তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো’ বাক্যটির মাধ্যমে রমজান মাসে এবং আইয়ামাম মা’দূদাতে সিয়াম পালনের জন্য প্রদত্ত বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পূর্ণসংখ্যার সমপরিমাণ দিনসংখ্যায় সিয়াম পালনের ব্যবস্থা দেয়া হয়েছে।

এটিও আল্লাহ আমাদের জন্য যা সহজ তা চাওয়ার এবং যা কঠিন তা না চাওয়ার একটি প্রমাণ। এ বাক্যটির দ্বারা কী বুঝানো হয়েছে এবং কিভাবে তা আমাদের জন্য সিয়ামের সংখ্যা সহজসাধ্য হওয়ার প্রমাণ বহন করে, তা পরের দিকের প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে।

সিয়াম আইয়ামাম মা’দূদাত অর্থাৎ নির্দিষ্ট কয়েকদিন পালন করতে হবে (দেখুন ০২:১৮৪ প্রথম অংশ)। তবে নির্দিষ্ট কয়েকদিন বললে দুটি কথা বুঝা যায়; (ক) দিন সংখ্যা বেশি হবে না। যেমন ২৯ বা ৩০ দিন হবে না, কারণ ২৯ বা ৩০ দিনে একমাস হয়ে যায়, তাই ২৯ বা ৩০ দিনকে কেউ কয়েকদিন বলে না, বরং এক মাস বা পুর্ণ একমাস বলে।

আর কুরআন মানুষের ভাষায় মানুষের বোধগম্য করে নাযিল করা হয়েছে। মানুষ যদি ‘কয়েকদিন’ বলতে একমাসকে না বুঝায়, তাহলে আল্লাহও কুরআনে ‘কয়েকদিন’ বলতে একমাসকে বুঝাবেন না। যদি একমাসকে বুঝানো হতো তাহলে ‘আইয়ামাম মা’দূদাত’/ ‘নির্দিষ্ট কয়েকদিন’ না বলে ‘শাহরুন ওয়াহিদুন’/ ‘একমাস’ বা ‘শাহরুন কামিলুন’/ ‘পূর্ণ একমাস’ শব্দটি বলা হতো।

আবার সুরা বাকারার ০২:১৮৩ আয়াতে বলা হয়েছে রোজার বিধান যেমন মুসলমানদের দেওয়া হল তেমনি আগের ধর্মের লোকদেরও ঐ একই বিধান দেওয়া ছিল। কিন্তু কোন ধর্মের লোকেরাই (যেমন খৃস্টান, ইহুদী, হিন্দু ইত্যাদি) এক নাগাড়ে একমাস রোজা পালন করে না। কাজেই এটা প্রমান করে যে রোজার বিধান এক মাস নাগাদ না বরং রমজান মাসে নির্দিস্ট কিছু দিনে যা হবে সর্বচ্চ দশ দিন।

এক মাস নাগাদ রোজা যথেস্ট কস্টকরও বটে বিশেষ করে গরম কালের কঠিন দিনগুলিতে যখন অনেক মানুষ অনেক সময় গরমের দাপটেই মারা যায়। মহান আল্লাহ সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব কাওকেই দেন না বরং তিনি অতি ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু।

[2 সূরা আল্ বাকারাহ্  286] আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না……।

[4 সূরা আন নিসা 28] আল্লাহ তোমাদের বোঝা হালকা করতে চান। মানুষকে দুর্বল করে সৃস্টি করা হয়েছে।

[39 সূরা আল-যুমার 53] হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ (কবিরা, সগীরা সহ সব গোনাহ) মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

বি.দ্রঃ এই ওয়েবসাইটে যে সব আর্টিকেল আছে তা বিভিন্ন সময়ে পাঠানো বিভিন্ন লেখকদের নিজস্ব মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। ওসব মতামতের জন্য www.QuranResearchBD.org কতৃপক্ষ কোনভাবেই দায়ী নয়।

22-07-16. Copyright © www.QuranResearchBD.org

 


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*